মোঃ আব্দুস সালাম সুজন
বিলুপ্তির পথে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাহন পালকী। এক সময়ের জনপ্রিয় এই বাহনটি একেবারেই নেই বললেই চলে। আধুনিক বাহনের দৌড়াত্বে ও কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে এই বাহনটি। শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী চিন্তা চেতনা ও ধ্যান-ধারনার কিছু মানুষ তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী বাহনকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করার জন্য ও কিছু কিছু বিয়ে বাড়িতে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে এই ঐহিত্যবাহী পালকীকে উপ¯’াপন করছে। এছাড়াও অভিজাত পরিবার গুলোতে ও গ্রামের কিছু বিয়ে বাড়িতে এখনো এই পালকীর ব্যবহার দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে এখনো কিছু কিছু বিয়েতে এই বাহন দেখা যায়। তবে আগের মতো জৌলস আর নেই। বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের নাটোর নওগাঁ, ও রংপুরের রাধানগর ইউনিয়নে ও মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া ও শিবালয়ে এখনো এই ঐতিহ্যবাহী বাহন পালকীর ব্যবহার হয়। ৯০ দশকের মাঝামাঝি ও শেষের দিকেও গ্রামঞ্চলে পালকীর ব্যবহার চোখে পড়তো। তবে আধুনিক বাহনের কাছে পরাজিত এই বাহন টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।এখন মানুষ কম সময়ের বাহনকেই বেছে নেয়। এই বাহনটির পাশাপাশি আরেকটি বাহন ছিল গরুর গাড়ি। সেটিও আজ বিলুপ্তির পথে ।
সাধারণত কাঠ দিয়ে তৈরি প্রাচীন যাত্রীবাহী বাহন পালকী। বাক্সের মতো ছোট একটি কক্ষ থাকে।যেখানে ২ জন অনায়াসে বসতে পারে। তবে ২ জনের অধিক যাত্রী ও অনেক সময় এই বাহনে চড়তে পারে। কক্ষের বাইরে দুই পাশে লম্বা বাঁশ বা কাঠের দণ্ড লাগানো থাকে।এই লম্বা কাঠের দন্ড কাঁধে নিয়ে বেহারারা গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলে। আগের দিনে যাতায়তের তেমন কোন মাধ্যম ছিল না। গরুর গাড়ি ও পালকী ছিল যাতায়তের একমাত্র মাধ্যম। এছাড়াও বেশ কিছু জায়গায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল। তবে ভারত ও বাংলাদেশে সহজে যাতায়ত করার জন্য পালকী ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন। সমাজের অভিজাত শ্রেনীর মানুষরা তাদের পরিবারের নারী সদস্যদের বাহিরে যাওয়ার জন্য পালকির ব্যবহার করতো। পালকি বহন করার জন্য সামনে ২ জন ও পিছনে ২জন মোট চারজন বেহারা থাক। যদি দুরত্ব বেশি হয় তাহলে এই সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারতো। পালকির উৎপত্তিস্থল ভারতীয় উপমহাদেশে । মৌর্য বা গুপ্ত যুগেও পালকির ব্যবহারের প্রচলন ছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আগের দিনে বাহন হিসেবে পালকী ছিল জনপ্রিয় ও মযার্দাপূর্ণ একটি বাহন। কনেকে তার পিতার বাড়ি থেকে বরের বাড়িতে ও বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়িতে নাইওর করাতে এই পালকী ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারের পর্দাশীল নারীরা পর্দা করতে এই পালকি বাহন হিসেবে ব্যবহার করতো । এছাড়াও অনেকে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে গেলে বা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বা কোন উৎসবে যোগ দিতে এই বাহনটি ব্যবহার করতো। তবে পালকি ব্যবহারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে । অনেক সময় দূরত্ব বেশি হলে পালকির বেহারা ও বেশি লাগতো । আর পালকি চালাতে শারীরিক ভাবে ও অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়। অনেকে অসু¯’ হয়ে যেত।
পালকীর নকশা ও ধরণ অনুযায়ী বেশ কয়েক রকমের হয়। যেমন সাধারণ পালকী ,আযনা পালকী,ময়ূরপঙ্খি পালকী। এর নকশা ও উপকরণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হয়। তবে সেগুন কাঠই বেশি ব্যবহার করা হয়। পালকী তৈরিতে সাধারণত হালকা কাঠ ব্যবহার করা হয়। কারণ ভারি কাঠ দিয়ে পালকী তৈরি করলে বেহারারা এটি বহন করতে অনেক কষ্ট অনুভব করবে। সাধারণত কাঠের মিস্ত্রিরা তাদের মনের মাধুরি দিয়ে নকশা করে থাকে। অনেক সময় পালকিতে পুরোনো দিনের ঐতিহ্যবাহী কিছু ছবি খোদাই করে নকশা করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ফুল ও লতাপতার ডিজাইন ও থাকে পালকীতে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ করে আকর্ষনীয় করে তুলাই দারুশিল্পীদের প্রধান কাজ। প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী বাহন বাংলায় এখন বিলুপ্তির পথে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মদের কাছে এই পালকী নামক বাহনের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। যারা এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। প্রাচীন এই বাহনকে টিকিয়ে রাখতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। কবি সত্যেন্দ্রনাথ তার কবিতায় লিখেছেন –
পালকী চলে !
পালকী চলে!
গগন-তলে
আগুন জ্বলে!
স্বব্ধ গাঁয়ে
আদুল গায়ে